Saturday, August 12, 2017

তথ্য প্রযুক্তির অলিম্পিয়াডে অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ


তথ্য প্রযুক্তির অলিম্পিয়াডে অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ


ফজলুস সাত্তার



প্রোগ্রামিংয়ের যুগঃ
বর্তমান যুগকে বলা হয় এরা অফ ইনফরমেশন টেকনোলজি বা তথ্য প্রযুক্তির যুগ। আর তথ্য প্রযুক্তির মূল চালিকা শক্তি বা প্রাণ ভোমরা হচ্ছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং। তাই অনেকে অবশ্য একে প্রোগ্রামিং এরা বা প্রোগ্রামিং যুগও বলে থাকে। এই যুগের জ্ঞান, প্রযুক্তি, আবিষ্কার, উদ্ভাবন, যোগাযোগ, ব্যাবসা-বাণিজ্য, পরিষেবা, বাক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সামরিক কমান্ড, গোয়েন্দা তৎপরতা, সমর কৌশল, সামাজিক যোগাযোগ, সম্পর্ক, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, গণমাধ্যম, শাসন পরিচালন সব কিছুরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং।

অর্থাৎ আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম ই-মেল, তথ্য অনুসন্ধানের জন্য ব্যবহৃত সার্চ ইঞ্জিন, ভয়েস বা ভিডিও কনভারসেশন, অনলাইন ব্যাংকিং, -কমার্স, ভার্চুয়াল এডুকেশন, -লাইব্রেরী, -বিজ্ঞাপন, অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া তো প্রোগ্রামিংয়েরই অবদান। এর সাথে যুক্ত হয়েছে পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, জৈবপ্রযুক্তি, চিকিৎসাসহ র্বিজ্ঞানের নানা গুরুত্বপূর্ণ শাখার গবেষণা, মিলিটারি ওয়ারফেয়ার, রাষ্ট্রীয়, আন্ত-রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর তথ্যের সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় কোষাগারসহ, ব্যাংকিং খাতে নিরাপত্তা এবং সর্বাধুনিক শিল্প উৎপাদনের মত বিষয়সমূহ ।কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের ছোঁয়া এইসব বিষয় বা খাতকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। যা উন্মোচিত করেছে সম্ভাবনার নতুন নতুন দুয়ার। যে কারণের সভ্যতার এই যুগে বিশ্বময় কম্পিউটার প্রোগ্রামিং হয়ে উঠেছে সবচেয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্লাউড কম্পিউটিং, বিগ ডাটা, ডাটা মাইনিং, ইন্টারনেট অফ থিংস (আই ও টি), আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এ আই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি নানা অভিধায় চলছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের বিপ্লব। সে কারণেই উন্নত ও উন্নয়নশীল নির্বিশেষে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই তাদের অস্তিত্বের তাগিদে সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে। সে জন্য এখন কোন কোন দেশ শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুদের কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে আগ্রহী করে তোলার দিকে নজর দেয়।

ব্যাটেল অফ জিনিয়াসঃ
অনূর্ধ্ব ২০ বছর বয়সের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কম্পিউটার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা হল জাতিসঙ্ঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড ইন ইনফরমেটিক্স (আই ও আই)। ১৯৮৯ সালে বুলগেরিয়ায় প্রাভেজ-এ প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় আই ও আই - এর। যা চলতি অগাস্ট মাসে ২৯তম বছর পূর্ণ করল। এই প্রতিযোগিতাকে অবশ্য অনেকেই বিশ্বের সেরা জুনিয়র কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কের লড়াই হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। সে কারণেই আই ও আই - এর ফলাফলের দিকে নজর রাখেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিভার্সিটি সমূহ।


আই ও আই ২০১৭ কন্টেস্ট হলে জুবায়ের রহমান নির্ঝর

আই ও আই ২০১৭ কন্টেস্ট হলে তাসমীম রেজা

আই ও আই ২০১৭ কন্টেস্ট হলে রুহান হাবীব

আই ও আই ২০১৭ কন্টেস্ট হলে সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান


আই ও আই এ অংশগ্রহণের পূর্বশর্তঃ
কোন দেশ ইচ্ছা করলেই আই ও আই-এ তাদের প্রতিযোগী পাঠাতে পারে না। এজন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম কানুন রয়েছে। যেমন ওই দেশে আই ও আই অনুমোদিত একটি জাতীয় কমিটি থাকতে হবে। অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টিম সিলেকশন করতে হবে। তবে কোন দেশেরই প্রতিযোগীর সংখ্যা ৪ জনের বেশি হতে পারবে না। তবে প্রয়োজনে এই সংখ্যা কম হতে পারে। আই ও আই - এর মুল প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট ২ দিনের হয়ে থাকে। মাঝখানে একদিন অবশ্য বিরতি থাকে। এই দুই দিনের মধ্যে প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টা করে প্রতিযোগীদের তাদেরকে দেয়া প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধান করতে হয়। সাধারণত এই সমস্যার সংখ্যা প্রতিদিন তিনটি করে হয়ে থাকে।

আই ও আই ২০১৭:
গত ২৮ জুলাই থেকে ৪ অগাস্ট ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড ইন ইনফরমেটিক্স (আই ও আই)- এর ২৯তম আসর। মোট ৮৪টি দেশের দল এবারের এই অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়। গতবারের মত এবারও প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নেয় স্কুল ছাত্র রুহান হাবীব, সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান, তাসমীম রেজা এবং কলেজ শিক্ষার্থী জুবায়ের রহমান নির্ঝর। বাংলাদেশের দলনেতা হিসেবে ছিলেন খ্যাতিমান কম্পিউটার বিজ্ঞানী, বাংলাদেশ ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) - এর কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ডঃ মোহাম্মাদ কায়কোবাদ। অবশ্য বুয়েটের একই বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডঃ মোহাম্মাদ সোহেল রহমানের নাম থাকলেও পেশাগত অনিবার্য কারণে শেষ মুহূর্তে তিনি তার তেহরান সফর বাতিল করেন।


তেহরান মিলাদ টাওয়ারে প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ কায়কোবাদ ও বাংলাদেশ আই ও আই টিম



আই ও আই ২০১৭ এর সমাপনি অনুষ্ঠান হল


পদক সংখ্যায় শীর্ষ ১৭:
তেহরানের অনুষ্ঠিত এবারের আই ও আই - এ মাত্র ১৭টি দলের সব ক'জন প্রতিযোগী পদক পেয়েছে। বাংলাদেশ আই ও আই টিম এই ১৭টির অন্যতম। এবারের আই ও আই- এ বাংলাদেশ দলের ৪ সদস্য রুহান হাবীব, সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান, তাসমীম রেজা এবং জুবায়ের রহমান নির্ঝর ব্রোঞ্জ পদক পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও যেসব দেশের ৪-জন করে প্রতিযোগী পদক পেয়েছে তা হল জাপান, চীন, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, ইরান, রাশিয়া, তাইওয়ান, চেক রিপাবলিক, যুক্তরাজ্য, বুলগেরিয়া, ইটালি, বেলারুশ, সুইডেন, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান, থাইল্যান্ড ও সার্বিয়া। আর পদকের মান বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে থেকেও ৪ জনের কম প্রতিযোগী বিজয়ী হওয়ায় পদক সংখ্যায় বাংলাদেশ পিছনে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউক্রেন, হাঙ্গেরি, জার্মানি, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, ক্রোয়েশিয়া, হংকং, জর্জিয়া, ফ্রান্স, এস্তোনিয়া, ম্যাকাও, মলদোভা, ফিলিপিনস, সাইপ্রাস ও তুরস্কের মত দেশকে।


আই ও আই ২০১৭ এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে রুহান হাবীব ও সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান

আই ও আই ২০১৭ এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাসমীম রেজা

আই ও আই ২০১৭ এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জুবায়ের রহমান নির্ঝর


পদক মান ও ক্রম উভয় বিচারে পিছিয়ে যেসব দেশঃ
এবারের আই ও আই- এর আসরে যেসব দেশ পদক পেয়েও মান ও ক্রম উভয় বিবেচনায় বাংলাদেশের পিছনে পড়েছে তার মধ্যে রয়েছে সার্বিয়া, ফিনল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, বেজিয়াম, গ্রিস, মেক্সিকো, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, আর্মেনিয়া, বসনিয়া-হারজেগোভিনা, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, কিরগিস্তান, লাতভিয়া, লিথুনিয়া, ম্যাসাডোনিয়া, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, স্লোভানিয়া, সুইজারল্যান্ড ও সিরিয়া।

শুন্য হাতে ফেরা দেশঃ
তেহরান ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড ইন ইনফরমেটিক্স থেকে কোন পদক ছাড়া শুন্য হাতে ফিরেছে ২৩টি দেশ। এই দেশ সমূহ হল নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, আয়ারলান্ড, স্পেন, লুক্সেমবার্গ, মন্টেনিগ্রো, আজারবাইজান, আর্জেন্টিনা, চিলি, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, কিউবা, এল সাল্ভাদর, জর্ডান, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, প্যালেস্টাইন, শ্রীলঙ্কা, কাজাখস্তান, তিউনেশিয়া, তুর্কমেনিস্তান এবং উজবেকিস্তান।

দলগত স্কোরে ইউরোপের ২৫টি দেশ থেকে এগিয়েঃ
দলগত স্কোরেও বাংলাদেশ টিম, এগিয়ে আছে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা মহাদেশ, এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো দেশ থেকে। শুধু কি তাই? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ইউরোপের ২৫টি দেশের টিম কম স্কোর পেয়েছে বাংলাদেশ দল থেকে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে স্লোভাকিয়া, ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, সাইপ্রাস, মলদোভা, লাতভিয়া, ডেনমার্ক, স্লোভানিয়া, তুরস্ক, ম্যাসাডোনিয়া, লিথুনিয়া, সুইজারল্যান্ড, আর্মেনিয়া, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, বস্নিয়া-হারজেগোভিনা, নেদারল্যান্ডস, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, স্পেন, আজারবাইজান, নরওয়ে, লুক্সেমবার্গ, আইসল্যান্ড, মন্টেনিগ্রো প্রভৃতি। উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোও দলগত স্কোরএ হেরেছে বাংলাদেশের কাছে।


বাংলাদেশ টিমের সাথে আই ও আই ২০১৭ এর প্রেসিডেন্ট


দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই সেরাঃ
পদক সংখ্যা ও মানের বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ সমূহের মধ্যে, বাংলাদেশের অবস্থানই শীর্ষে। আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারতের তথ্য প্রযুক্তি খাত থেকে বছরে প্রায় দেড়শ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়। গত অর্থবছরে শুধুমাত্র সফটওয়্যার রপ্তানি থেকেই তাদের আয় ছিল ১০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এবছর তা ১২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। এত বড় বিশাল তথ্য প্রযুক্তি খাত এবং বিপুল প্রণোদনা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় প্রতিযোগীরা এবছরের আই ও আই - এ ৩টি ব্রোঞ্জে পদক পেয়েছে। অথচ মাত্র ১৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সফটওয়্যার রপ্তানিকারি বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা কোন ধরনের প্রণোদনা এবং উল্লেখযোগ্য সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই কৈশোরের উদ্যমতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছে ৪টি ব্রোঞ্জ পদক।

পেছনে ফিরে দেখাঃ
ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে আই ও আই - এর পথচলা শুরু হলেও কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের এই মর্যাদাপূর্ণ আসরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের শুভ সূচনা ২০০৫ সাল থেকে। সিটি কলেজের ছাত্র আবিরুল ইসলামের ২০০৯ সালের সিলভার পদক বাংলাদেশের প্রথম প্রাপ্তি। ২০১০ ও ২০১১ সালে পর পর ২ বছর শুন্য হাতে ফেরার পর ফের সাফল্য আসে ২০১২ সালে। ওই বছর ধনঞ্জয় বিশ্বাস ও বৃষ্টি শিকদার ব্রোঞ্জ পদক পান। ২০১৩ সালে ধনঞ্জয় পুনরায় ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন। ২০১৩ সালের পর ফের ২ বছরের পদক-খরা।

ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ দলঃ
২০১৫ ও ২০১৬ সালের ন্যাশনাল হাই-স্কুল প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট (এন এইচ এস পি সি) - তে ধারাবাহিক সাফল্য এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনলাইন প্লাটফরমে কন্টেস্ট রেটিং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আই ও আই কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কাড়েন ৯ম শ্রেণির ৩ কিশোর রুহান হাবীব, সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান ও তাসমীম রেজা। পরবর্তীতে অসংখ্য টিম সিলেকশন কন্টেস্ট এবং বাংলাদেশ ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড ন্যাশনালের বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই তিন জন জায়গা করে নেয় ২০১৬ সালে রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত আই ও আই - এর ২৮তম আসরের টিমের সদস্য হিসেবে। বাংলাদেশ ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড ন্যাশনালের বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এদের সাথে আরও যুক্ত হয় দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র জুবায়ের রহমান নির্ঝর। বাংলাদেশর আই ও আই - এ অংশগ্রহণের ইতিহাসে এটাই ছিল সর্বকনিষ্ঠ দল। আই ও আই - এর ওই আসরে ওই টিমের সদস্য রুহান হাবীব ও সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়। অবশ্য এই টিমের অপর সদস্য তাসমীম রেজা দুর্ভাগ্যজনক ভাবে মাত্র ৩ পয়েন্ট এর জন্য পদক বঞ্চিত হয়।


রাশিয়ার কাজানে কোচ কায়সার আব্দুল্লাহ সহ বাংলাদেশ আই ও আই ২০১৬ টিম


সেরা দল, সেরা সাফল্যঃ
কাজানের সাফল্য এই টিমের সদস্যদের মনোবল এবং মানসিক দৃঢ়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। যার প্রতিফলন ঘটে দেশের অভ্যন্তরে এ সি এম আই সি পি সি, ন্যাশনাল কলেজিয়েট প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট (এন সি পি সি) সহ বিভিন্ন আন্তঃ বিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট সমূহে। ২০১৬ সালে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত "এন এস ইউ সাইবারনাটস" প্রোগ্রামিং কন্টেস্টে এই টিমের সদস্য তাসমীম রেজা, রুহান হাবীব ও সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান এর সমন্বয়ে গঠিত "আই ও আই এল ও এল" দল বুয়েট সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ১২০টি ইউনিভার্সিটি টিমকে পরাজিত করে ২য় স্থান দখল করে বড় ধরনের চমক দেয়। কারণ ইউনিভার্সিটি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদা পূর্ণ কম্পিউটার প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট এ সি এম আই সি পি সি ওয়ার্ল্ড ফাইনালস - এ অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের সব গুলো টিমই এই কন্টেস্টে অংশ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম "ডি ইউ সেন্সরড" এই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় টাইম পেনাল্টির কারণে, সমস্যা সমাধানের পরিমাণে নয়। পরবর্তীতে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আই ইউ বি এ টি), ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি (আই ইউ টি), স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ (এস ইউ বি) সহ বিভিন্ন আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় কন্টেস্টে এই টিমের সদস্যরা তাদের সাফল্যের ধারাবায়িকতা বজায় রাখে। যার ফলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সেরা দল গুলোকে হারানো আই ও আই টিমের সদস্যদের নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এ অনুষ্ঠিত এন সি পি সি ২০১৭ - তে সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান, তাসমীম রেজা, রুহান হাবীব এর সমন্বয়এ গঠিত দল "আই ও আই এল ও এল" দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের দলসমূহকে হারিয়ে ২য় দখল করে। ৫ ঘণ্টার কন্টেস্টে সাড়ে চার ঘণ্টাই এই টিমটি শীর্ষস্থান ধরে রেখে শেষ মুহূর্তে "বুয়েট রেয়ো"র কাছে হেরে যায়।


এ সি এম আই সি পি সি ২০১৬ - এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আই ও আই টিমের ২ জন

এন এস ইউ সাইবারনাটস ২০১৬ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আই ও আই টিম

আই ইউ বি এ টি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রামিং কন্টেস্টে আই ও আই টিম

এন সি পি সি ২০১৭ তে আই ও আই টিম


ব্যাক্তিগত পর্যায়েও বাংলাদেশ আই ও আই টিমের সদস্যরা অসাধারণ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। ন্যাশনাল হাই-স্কুল প্রোগ্রামিং কন্টেস্টএর শীর্ষ চার স্থান এই টিমের সদস্যদের দখলে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনলাইন কন্টেস্ট প্লাটফরমেও তারা সারা বিশ্বের প্রতিযোগীদের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেদের যোগ্যতার সাক্ষর রাখছে। অনলাইন কোয়ালিফাইং রাউন্ডে অংশগ্রহণ করে এই টিমের তিন সদস্য তাসমীম রেজা, রুহান হাবীব ও সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান এবছর রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ইনোপলিস অলিম্পিয়াডে অন-সাইট ফাইনালে অংশগ্রহণের জন্য সিলেক্টেড হয়। সারা বিশ্ব থেকে সিলেক্টেড ৪০ জনের মধ্যে বাংলাদেশের এই ৩ জনের অবশ্য স্পন্সরের অভাবে ওই অলিম্পিয়াডে যাওয়া হয় নাই। ইনোপলিস অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের তিন জনের বিপরীতে চীন ও ভারতের ২ জন করে প্রতিযোগী সিলেক্টেড হয়।


এন এইচ এস পি সি ২০১৭ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে রুহান হাবীব




চলতি বছরে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ব্যাক্তিগত পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ আই ও আই টিমের অপর সদস্য জুবায়ের রহমান নির্ঝর।

রুহান ও রুবাবের ডাবল মেডালঃ 
গতবছর পর্যন্ত আই ও আই – এ অংশগ্রহণকারি বাংলাদেশী প্রতিযোগিদের মধ্যে পর পর দুই বছর পদক পাওয়ার গৌরবটি ছিল একমাত্র ধনঞ্জয় বিশ্বাসের দখলে। সে ২০১২ ও ২০১৩ সালে পর পর দু' বছর আই ও আই - এ ব্রোঞ্জ পদক পায়। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে পর পর দু' বছর ব্রোঞ্জ পদক পেয়ে ধনঞ্জয়ের এই রেকর্ডে এই বছর ভাগ বসিয়েছে দুই কিশোর রুহান হাবীব ও সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান।


আই ও আই ২০১৬ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে রুহান হাবীব ও সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান




আরও বড় সাফল্যের হাতছানিঃ
বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ বার আই ও আই - এ অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইন্সিটিউট অফ টেকনোলজি (এম আই টি) - তে অধ্যয়নরত বৃষ্টি শিকদার। যিনি ২০১১ থেকে ২০১৪ সালে পর্যন্ত একটানা ৪ বছর আই ও আই - এ প্রতিযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। বৃষ্টি শিকদারই বাংলাদেশের একমাত্র আই ও আই পদকধারী নারী। তিনি ২০১২ সালে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন। বর্তমান বাংলাদেশ টিমের চার সদস্যর মধ্যে একমাত্র জুবায়ের রহমান নির্ঝর তার উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের লেখাপড়া শেষ করেছেন। তাসমীম রেজা ও সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান আগামী বছরের এস এস সি পরীক্ষার্থী। রুহান হাবীব গত জুন মাসে ও - লেভেল সম্পন্ন করেছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ টিমের অন্ততঃ তিন জন সদস্যের পারফরমেন্সের ধারাবাহিকতা সাপেক্ষে আরও দুই-তিন বার আই ও আই - এ অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তাই আগামী ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের আই ও আই বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার হাতছানি হয়ে আসছে। কেননা, প্রয়োজনীয় প্রেরণা, প্রণোদনা ও সহয়তা পেলে অতীতের সাফল্যের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অব্যহত চেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ আই ও আই টিমের এই সদস্যদের পক্ষে দেশের জন্য বড় ধরনের কোন অর্জন অসম্ভব কিছু নয়। শুধু যেটা দরকার তা হলো তাদেরকে নিরবিচ্ছিন্ন চর্চার জন্য সরকারি, বেসরকারি এবং পারিবারিক পর্যায়ে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া।


তেহরান যাত্রার পূর্বমুহূর্তে বিমান বন্দরে আই ও আই টিমের সাথে 
প্রফেসর ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, প্রফেসর ডঃ মোহাম্মাদ কায়কোবাদ,
প্রফেসর ডঃ মোহাম্মাদ সোহেল রহমান ও পরিবারের সদস্যরা।


লেখক পরিচয়ঃ লেখক একজন মানবাধিকার বিষয়ক গবেষক এবং বাংলাদেশ আই ও আই টিমের সদস্য রুহান হাবীব-এর বাবা।

যোগাযোগঃ fazloussatter@yahoo.com

Featured Post

Geopolitics of the Teesta Water and the Annexation of Sikkim by India

Fazlous Satter The Chinese proverb, "Those who govern the water govern the country," aptly illustrates the significance of river...